NAVIGATION MENU

সিনচিয়াংয়ের গুজা গ্রামের সুন্দর জীবন


শুয়েই ফেই ফেই ও ওয়াং ছুই ইয়াং

গুজা হল চিনের সিনচিয়াং উইগুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কাশগর এলাকার একটি গ্রাম। গুজার প্রতিটি বাড়ির কাজুবাদামের ক্ষেতে মরিচের চাষ দেখা যায়। সম্প্রতি চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) এক সাংবাদিক গুজা গ্রাম পরিদর্শন করেন। তিনি এ গ্রামের কৃষকদের মরিচের চারা লাগাতে ব্যস্ত দেখতে পান। সাংবাদিকের কাছে এ দৃশ্য অভূতপূর্ব মনে হয়েছে। কারণ তাঁরা যোন ছোট ছোট মরিচের চারাগুলোকে বপনের মাধ্যমে তাঁদের জীবনের সমৃদ্ধির স্বপ্ন বুনছিলেন।

কৃষক তোহতিগুল ইউসুপ সিএমজির সাংবাদিককে জানান, “আগে আমি ১০ মু (এক মু সমান ৬৬৬ বর্গমিটার) জমিতে তুলা চাষ করতাম। সঙ্গে আরও পাঁচ মু মরিচ চাষ করতাম। প্রতি মুতে তুলা চাষ থেকে আয় হয় এক হাজার ইউয়ানের মতো। তবে, প্রতি মু জমিতে মরিচ চাষে আয় হয় চার হাজার ইউয়ানেরও বেশি। যা তুলা চাষের চার গুণ। তাই চলতি বছর আমি মোট ১০ মু মরিচ চাষ করেছি।”

তিনি বলেন, তাঁর পরিবারের ১৫ মু অর্থাৎ প্রায় এক হেক্টর জমি আছে। গত বছর পাঁচ মু জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে মরিচ চাষ করা হয়। সেই বছর তাঁদের পরিবারের আয় হয় ২০ হাজার ইউয়ান। মরিচ চাষে ভালো মুনাফা পাওয়ায় চলতি বছর ইউসুপ মরিচ চাষের আয়তন  দ্বিগুণ করেছেন।

গুজা গ্রামে মোট ৩৮৪টি পরিবারে মোট ১,৭৩৪ জন মানুষ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে নিবন্ধিত দরিদ্র পরিবার ১৮১টি। এসব পরিবারে লোকসংখ্যা ৮৪২ জন। গ্রামবাসীদের দারিদ্র্যমুক্ত করতে গ্রামের কার্যালয় কৃষি সহযোগিতা কমিউনিটি স্থাপন করেছে। স্থানীয় উত্পাদনের অবস্থা এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী, মরিচসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যময় সবজি চাষের মাধ্যমে আয় বাড়ানো হয়। কমিউনিটি কৃষকদের প্রযুক্তিগত সমর্থন দেয়। তাঁদের বিক্রিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সুবিধা দিয়ে থাকে। এবং তাঁদের সব দুঃচিন্তা দূর করে।

ইউসুপ বলেন, “প্রথমত, আমাদের গ্রামের কার্যালয় আমাদের বিনা খরচে বিভিন্ন প্রযুক্তি পরিচালনা শেখায়। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিনা খরচে রাসায়নিক সার দেয়। তৃতীয়ত, মরিচ চাষের সময় পানি ব্যবহারের সমস্যা সময়মত সমাধান করে।”

গুজা গ্রামে মানুষ বেশি, কিন্তু জমি কম। পুরো গ্রামে কৃষিজমির আয়তন ২৯৯১ মু। মাথাপিছু জমির আয়তন মাত্র ১.৭ মু। সিনচিয়াংয়ের গ্রামে নিযুক্ত কর্মীদল জমিহীন বা অল্প জমির অধিকারী কৃষকদের সুনির্দিষ্ট সহযোগিতা করে আসছে।

গুজা গ্রামের কর্মীদলের সদস্য আবলাত ইউনুস সিএমজির সাংবাদিককে জানান, “আমি শা চ্য জেলার জলসেচ ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা। আমাদের ব্যুরো গুজা গ্রামের দারিদ্র্যবিমোচনে সাহায্য করেছে। শা চ্য জেলার জলসেচ ব্যুরোর ৬৯ জন কর্মকর্তা এই কাজে অংশ নিয়েছেন। প্রতি মাসে সব কর্মকর্তা স্থানীয় গ্রামবাসীদের বাসায় গিয়ে একবার খোঁজ-খবর নেন। তাঁদের মৌলিক অবস্থা, কর্মসংস্থানের অবস্থা, কৃষিকাজের অবস্থা, এবং কৃষিজাত দ্রব্য বিক্রির অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। কৃষকের যদি কোনো সমস্যা থাকে, তবে সাহায্যকারী কর্মকর্তারা সমাধান করার চেষ্টা করেন। না পারলে, গ্রাম কার্যালয়কে অবহিত করেন। কার্যালয় সভা আয়োজন করে সমাধানের পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। যদি তারপরও সমাধান করা না যায়, তখন গ্রাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কৃষকদের সমস্যা সমাধান করা হয়।”

গুজা গ্রামের কর্মীদলের সদস্য লি জুন জানান, তাঁরা ‘একটি পরিবারের জন্য একটি নীতি’র সহায়তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। কারণ প্রত্যেক পরিবারের দারিদ্র্যতার কারণ ভিন্ন। তাই প্রত্যেক পরিবারের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। তাঁরা মনে করেন, ‘দারিদ্র্যবিমোচনের পাশাপাশি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করা’ হল দরিদ্র মানুষের সংগ্রামে উত্সাহ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

তিনি বলেন, গ্রামের দারিদ্র্যবিমোচন কাজের সাহায্যে গ্রামবাসীদের চিন্তাধারা আরও প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠেছে। তাঁরা সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন কাজ করতে পারছেন।

গুজা গ্রামের আরেক অধিবাসী তুবুহান রুজি’র পরিবারের কোনো চাষের জমি নেই। তিনি আগে গ্রামের কর্মীদলের সদস্য লি জুনকে সহায়তা করতেন। সরকারি সাহায্যের পর তুবুহান রুজির পরিবার ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দারিদ্র্যমুক্ত হয়। এখন তুবুহান রুজি শা চ্য জেলার একটি হস্তশিল্প কমিউনিটিতে হাতে তৈরি সোফা তৈরির কাজ পেয়েছেন। তাঁর প্রতি মাসের বেতন সাড়ে তিন হাজার ইউয়ানেরও বেশি। তাঁর স্বামী স্থানীয় বাজারে একটি পোশাকের দোকান খুলেছেন। প্রতি মাসে তাঁর আয় পাঁচ হাজারেরও বেশি ইউয়ান।

লি জুন বলেন, তুবুহান রুজির হাতের সোফা তৈরিতে বিশেষ কৌশল ও দক্ষতা দরকার। এভাবে তিনি এক দিকে কাজের মাধ্যমে স্থিতিশীল উপার্জন করেন। অন্যদিকে সময়মতো কাজ শুরু করতে পারেন এবং সময়মতো কাজ শেষ করে বাসায় যেতে পারেন। তিনি দুপুর বেলা বাসায় গিয়ে শিশুদের যত্নও নিতে পারেন।

তুবুহান রুজির বাসা একদম গ্রাম কার্যালয়ের পাশে অবস্থিত। তাঁর উনয়াশি বর্গমিটার বাড়িটির সামনে একটি চওড়া ও সুন্দর ওঠান আছে। সেখানে কিছু সবজি চাষ করেন তিনি। সাংবাদিকরা যখন তাঁর বাসায় ঢোকেন, তখন তিনি শিশু ও বৃদ্ধার সঙ্গে ওঠানে বসে ফল খাচ্ছিলেন আর আড্ডা দিচ্ছিলেন।

এই বাড়ি সম্বন্ধে তুবুহান রুজি বলেন, “সরকার আমাদেরকে সাড়ে ২৮ হাজার ইউয়ান ভর্তুকি দিয়েছে। সেই সঙ্গে আমি ও আমার স্বামীর জমানো টাকা দিয়ে ২০১৮ সালে আমরা আমাদের নিজেদের এই বাড়ি নির্মাণ করেছি। এ ছাড়া, আমরা ভালোভাবে স্থাপত্য ভর্তুকি, চিকিত্সা, শিক্ষা এবং অন্যান্য আর্থিক ভর্তুকি উপভোগ করেছি।”

তুবুহান রুজির পরিবারে মোট পাঁচ জন সদস্য আছেন। তাঁর বড় মেয়ে সিনচিয়াং উইগুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের রাজধানী উরুমুছিতে মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করছে। তাঁর ছেলে স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। তাঁর ছোট মেয়ে এখন প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বর্তমান জীবন সম্বন্ধে তুবুহান রুজি খুব সন্তুষ্ট।

তিনি বলেন, “আমার কাজ এবং জীবন নিয়ে আমি খুব সন্তুষ্ট। আমি কমিউনিস্ট পার্টিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আরও ধন্যবাদ জানাতে চাই গ্রামের সব কর্মকর্তাদেরকে।”

গত বছরের নভেম্বরে গুজা গ্রামের সবাই দারিদ্র্যমুক্ত হন। গ্রামের সবার মাথাপিছু আয় হয় ১১ হাজার ইউয়ান। গ্রামের কর্মীদলের সদস্য হিসেবে লি জুন খুব গর্বের সঙ্গে বলেন, এখন পুরো গ্রাম দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে, জনগণের জীবনযাপন নিশ্চিত হয়েছে। পরবর্তীতে গ্রামের সব কর্মকর্তাদের কাজ হবে গ্রামবাসীদের সাংস্কৃতিক জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করা।

তিনি বলেন, রাতের বেলায় এখানে একটি নৈশ বাজার গড়ে ওঠবে। লোকজন এখানে আনন্দ করবেন, সেইসঙ্গে লোকজনের আয় বাড়বে। গ্রামবাসীরা নিজের বাসার রান্না করা সুস্বাদু খাবার নিয়ে রাতের বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। রাতের ব্যবসা বাণিজ্যের জীবন উপভোগ করার সঙ্গেসঙ্গে কিছু আয়ও করতে পারবেন তাঁরা।

গ্রামের নতুন নির্মিত সাংস্কৃতিক চত্বরে দাড়িয়ে লি জুন সিএমজির সাংবাদিককে গুজা গ্রামের সুন্দর ভবিষ্যতের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, গ্রামের কর্মকর্তারা গুজা গ্রামের বৈশিষ্ট্যময় পর্যটন শিল্প এবং গ্রামবাসীদের বাসায় পারিবারিক হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। তাঁরা খুব দ্রুত দেশ বিদেশের পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাতে পারবেন। তিনি সবাইকে গুজা গ্রামে এসে স্থানীয় সংস্কৃতি ও সুন্দর গ্রামীণ জীবন উপভোগের আহ্বান জানান।

- লেখকদ্বয় চীনা নাগরিক। তাঁরা চায়না মিডিয়া গ্রুপের বেইজিং কার্যালয়ের বাংলা বিভাগে কর্মরত সাংবাদিক।