ন্যাভিগেশন মেনু

বাঙালির মুক্তিদাতা জাতির পিতার আজ শুভ জন্মদিন


আজ  ১৭ মার্চ। বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলে বিশ্বে আজ আমরা সম্মানের সঙ্গে বাঙালি হিসেবে একটা স্বতন্ত্র পরিচয় অর্জন করেছি। এক সময় স্বাধীন বাংলাদেশ- যা ছিল বাঙালিদের কাছে একটা স্বপ্নের মতো। ঝোঁপ-জঙ্গলে ভরা এই বঙ্গের মানুষেরা ছিল অতি সাধারণ। স্বাধীনতা কী তা তাঁদের কোন কাছে কোন ধারণা ছিল না।

আজ বাংলাদেশের সবকিছুতেই অনিবার্যভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম চলে আসে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে বাদ রেখে এক লাইনও বাংলাদেশের  ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়।

এটা অনুধাবন করেই কবি-মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায়- বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি ও বাংলাদেশে চিরস্থায়ী নেতা আখ্যা দিয়ে লিখেছেন- ‘যতদিন রবে পদ্মা-যমুনা গৌরী-মেঘনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানোর যে সূচনা বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, তারই প্রতিফলন ঘটান প্রায় ১৯ বছর পর। ১৯৭১-এ, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছেই পাওয়া বাঙালির আত্মার সংযোগ, আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। তিনি অবিসংবাদিত নেতা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ।

বাঙালির জীবনযাত্রা ছিল অতি সাধারণ। কৃষি প্রধান এই অঞ্চলের মানুষ দিনভর মাঠে কাজ শেষে বিকেলেই ঘরে ফিরতো। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়তো। উন্নত জীবনযাত্রা কী, তা ছিল অজানা।

তদুপরি বিদেশি বর্গিরা এই জনপদে এসে হানা দিয়ে সম্পদ লুটে-পুটে নিয়ে যেতো। বর্গিদের ভয়ে মানুষ থাকতো তটস্থ। আমাদের সরলমনার সুযোগ নিয়ে বিদেশি শক্তি বণিক থেকে শাসক রুপে চেপে বসেছে বারে বারে। তাদের একটাই লক্ষ্য এই বাংলার সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া।

একাধিক বিদেশি বর্গি আমাদের ঘাড়ে এসে চেপে বসেছে। প্রথমে তারা আমাদের দেশে এসেছে বণিকের ছদ্মবেশে। এরপর সুযোগ বুঝে শোষকরুপে চেপে বসেছে।

গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাবা-মা  ছেলের নাম আদর করে রেখেছিলেন খোকা। সেই ছোট খোকাই বাঙালি জাতির ত্রাতা। তাই তো বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে উপাধী দিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পেতাম না। পরিচিতি লাভ করতে পারতাম না বাঙালি হিসেবে। বিশ্বে বাঙালি আজ কর্মঠ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছে।  দেশও লাভ করছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ পাকিস্তানের শাসনে থাকলে আমাদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকতো না। বাঙালি জাতির জাতি জীবনে কখনো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি ঘটতো না।

বঙ্গবন্ধু জন্ম না নিলে আজও আমরা পরাধীন রাজ্যের নাগরিক হিসেবে থাকতাম। বিশ্বে ‘বাংলাদেশ’  রাষ্ট্রের নামটাই সৃষ্টি হতো না। বাঙালী জাতি ও এই জনপদের অস্তিত্ব হাজার বছর ধরে চলে আসলেও কখনই স্বাধীন-সার্বভৌম একক রাষ্ট্র ছিল না।

যুগ যুগ ধরে থাকা বঞ্চিত বাঙালিকে ভালবেসে নিজের জীবন উৎসর্গ করে বঙ্গবন্ধু আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটা স্বাধীন দেশ দিয়ে গিয়েছেন। শুধু আমরা নয়, গোটা বিশ্ব যাকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে চেনেন, আজ সেই বিশ্ববন্ধুর ১০১তম জন্মদিন।

আজ  বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উন্নত বিশ্বে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা সারা বিশ্বে প্রশংসা  লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ২০ বছরের সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাঙালি জাতি মুক্তি পেয়েছিল। শেখ মুজিবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে, যার কাছে যা আছে, তা নিয়ে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা অর্জন করতে পারতাম না।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।   ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও তাঁর স্বপ্ন, আদর্শ, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে পড়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

একথা ঠিক- বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ছোট করতে চাইলে সেই ছোট হবে। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির কাছে এবং বিশ্ববাসীর মনে যে স্থানে রয়েছেন তিনি সেখানেই থাকবেন।বাঙালি জাতির নির্দিষ্ট মানচিত্রও তৈরি হতো না। আজকে আমরা বাংলাদেশ পরিচয়ে বিদেশের দূতাবাসে, জাতি পরিচয়ে কর্মযজ্ঞ চালাতে পারতাম না। তাই বঙ্গবন্ধুর এ ঋণ কোনো দিন শোধ করার নয়।

 বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি যখন স্বাধীনতার জন্য উদগ্রীব তখুনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি নিধন শুরু করে। ঠিক তখনই জাতির পিতা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানিরা এ বিজয় মেনে নিতে পারেনি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দেন বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বাংলার জনগণ তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল।

৭ মার্চের ভাষণের পর ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসন অচল হয়ে পড়েছিল। ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে তিনি যে নির্দেশ দিতেন সে অনুযায়ী দেশ চলতো। ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধে বিজয় যে অবশ্যম্ভাবী, সে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাঙালি তার নির্দেশ পালন করে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছিল।

১৯৭১ সালের  ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তানিরা বাধ্য হয়েছিল তাদের দেশে বন্দি করে রাখা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। 

আমাদের যুদ্ধকালে  বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত আমাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিল। আমাদের এক কোটি শরাণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল। ব্যবস্থা করেছিল খাদ্য-বস্ত্রের।  মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, অস্ত্র দিয়েছিল। এমন কী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ থামাতে কিছু বিদেশি শক্তি উদ্যোগী হয়েছিল। কিন্তু ভারত পাশে থেকে আমাদের মুক্তি অর্জনে সমর্থন দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি  পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। সেখান থেকে লন্ডন যান। তারপর দিল্লিতে হয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন। ১০ জানুয়ারি তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করেছিলাম সত্য কিন্তু তারপরও বঙ্গবন্ধু দেশে না ফেরা পর্যন্ত সকলের কাছে মনে হয়েছিল স্বাধীনতার আনন্দ যেন অধরা।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ তুলনাহীন। বাংলার মানুষের দাবি-দাওয়া বলতে গিয়ে তিনি জীবনের দীর্ঘসময় কারাগারে কাটিয়েছেন। এ দেশের মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও উন্নত জীবন পায় এটাই ছিল তার স্বপ্ন। আজ জাতির পিতার জন্মদিনে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবো, এটাই আমাদের প্রত্যয়।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটিতে এসে তাঁর বাসভবনে না গিয়ে চলে গিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে, তার প্রিয় জনগণের কাছে। তিনি দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে। যে বিজয়ের আলোকবর্তীকা তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সে মশাল নিয়ে আমরা আগামী দিনে চলতে চাই।

তাঁর জন্মদিনে বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্রমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে চাই। বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে চলবে সম্মানের সঙ্গে চলবে বাংলাদেশ।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। ঐতিহাসিক এই দিনটিতেই মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

অথচ স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত অপশক্তি এখনও দেশকে ধ্বংসের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সারাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যত উন্নয়ন হয়েছে, উন্নয়ন সবার সামনে আজ দৃশ্যমান। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রশংসিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিনজারের কথিত তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র-চিকিৎসার দায়িত্ব সুচারুরুচে পালন করছে।। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে।

লেখক: বাংলাদেশ পোস্ট (অনলাইন) –এর নির্বাহী সম্পাদক

Kumar.sarkerbd@gmail.com