NAVIGATION MENU

দারিদ্র্যবিমোচন ও পরিবেশ সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ নিতে পারে চীন ও বাংলাদেশ


লি ওয়ান লু শিশির

চীন ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যকার আদান-প্রদানের রয়েছে সুদীর্ঘ ও সোনালী ইতিহাস। কয়েক হাজার বছেরের এ গভীর সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে দুটি দেশ তাদের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারে উন্নীত করেছে। ফলে দুদেশের প্রায় সব ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুগভীর।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। চীন-বাংলাদেশ সুগভীর সম্পর্কের চিহ্ন বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র বিদ্যমান। উভয় দেশ একই ধরনের স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ২০১৪ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার কঠিন লড়াইয়ে লিপ্ত। চীনও ২০৪৯ সালের মধ্যে একই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায়।  তাই  এ সময়ে চীন ও বাংলাদেশ একে অপরের স্বপ্নের সারথি হতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও দেশটির স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এক ভিডিও বার্তায় এমন প্রত্যয়ের কথাই বলেছেন। চীনা প্রেসিডেন্টের বার্তা আলোকে উভয় দেশ নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে লাভবান হতে পারবে। যেহেতু দুদেশই উন্নত হবার স্বপ্ন দেখছে, সেহেতু দারিদ্র্যবিমোচন ও পরিবেশ সংরক্ষণ তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটো খাত।

চীন গেল বছর চরম দারদ্র্যকে তার দেশ থেকে বিদায় করেছে। সেসঙ্গে পরিবেশ খাতেও অনেক উন্নয়ন করেছে। তাই বেইজিংয়ের রয়েছে এ ক্ষেত্রে বিপুল অভিজ্ঞতা ও উন্নততর প্রযুক্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে  বাংলাদেশ উভয় খাতে সম্পর্ক জোরদার করতে লাভবান হতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে চীনের উদ্ভাবিত  চুনচাও মাশরুম উতপাদনের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে। কারণ ইতোমধ্যে চীন এর মাধ্যমে অনেক দেশকে কাঙ্খিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। পৃথীবির বিভিন্ন দেশে চুনচাও চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। তারা নিজেদের প্রাচীন চাষাবাদ বাদ দিয়ে একে দারিদ্র্যবিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যকর উপায় হিসেবে গ্রহণ করছে।  ২০১৭ সালে চুনচাও প্রযুক্তি জাতিসংঘ ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তাবয়নের একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

ফুজিয়ান কৃষি ও বনবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাশরুম গবেষণালয়ের অধ্যাপক লিন চান সি ১৯৮৬ সালে  আবিষ্কার করেন চুনচাও চাষ পদ্ধতি। তখন থেকে এটি উন্নয়নশীল দেশসমূহের দারিদ্র্যবিমোচন, খরা হ্রাস, মরুকরণ মোকাবিলা, এবং পশুপালন উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ২৬৬ বারের মতো চুনচাও পদ্ধতির প্রশিক্ষণ ক্লাসের আয়োজন করা হয়েছে এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশক্ষিণ দেওয়া হয়েছে। নানা অঞ্চলের ১২টি দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চুনচাও পদ্ধতির দৃষ্টান্ত কেন্দ্র। চুনচাও পদ্ধতি ১৫টি ভাষায় অনূদিত এবং ১০০টি দেশ ও অঞ্চলে প্রচারিত হয়েছে।

পাপুয়া নিউ গিনির পূর্ব-পার্বত্য প্রদেশের গৃহিনী জাকাবরি। তিনি প্রতিদিন নিজের চুনচাও ক্ষেতে গিয়ে মাসরুম বাছাই করেন। গেল বছরে মাশরুশ চাষের মাধ্যমে তিনি ১৫ হাজার কিনা (স্থানীয় মুদ্রা) অর্জন করেন। স্থানীয় পরিবারগুলোর অধিকাংশই কফি ও সবজি চাষ করে এবং তাদের বার্ষিক আয় মাত্র দুই থেকে এক হাজার কিনা।

জাকাবরি জানিয়েছেন, চুনচাও  মাশরুমের চাষে কোন সার এবং কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। এর পরিবহনও সহজ বলে এ ব্যবসার আয় সবজি চাষের  চেয়ে ২০-৩০ গুণ বেশি। মাশরুশ চাষের মাধ্যমে তাঁর জীবন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। উপার্জিত টাকা দিয়ে তিনি তাঁর শিশুকে স্কুলে পাঠতে এবং নতুন পোশাক কিনতে পারছেন।

পূর্ব-পার্বত্য প্রদেশের গভর্নর বলেছেন, “তাঁরা চুনচাওকে চীনের উপহার মনে করেন। বর্তমানে প্রদেশটিতে মাশরুশ চাষি ৭০০ পরিবারের আছে এবং এর ৭০ শতাংশ নারী। তিনি বলেন, এটি আমাদের দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য এক বিশেষ উপহার”।

পাপুয়া নিউ গিনি বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম। ১৯৯৭ সালে দেশটির প্রাদেশিক সরকারের আমন্ত্রণে চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল সেখানে গবেষণা করেন। পরে তাঁরা সেখানে একটি চুনচাও চাষ দৃষ্টান্ত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটির কার্যক্রম ২০ বছর ধরে অব্যাহত রাখেন।

চীনা বিশেষজ্ঞ লিন ইং সিং জানিয়েছেন, চীনা বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টায় এখন পূর্ব পার্বত্য-প্রদেশে কফির পর চুনচাও চাষ দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প। এ পর্যন্ত চীনা বিশেষজ্ঞরা সেখানে ১৮বারের মতো প্রশিক্ষণ ক্লাস নিয়েছেন। এবং মোট ১,৩৩৭জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

ফিজিতে এক হেক্টর জমিতে উতপাদিত চুনচাও ৩০টি গরু বা ৩০০টি ছাগলকে খাওয়ানো হয়। চুনচাও খেলে গরু ও ছাগলের শারীরিক বৃদ্ধি দ্রুত ঘটে। আফ্রিকান দেশ লেসোথোয় চুনচাও চাষকে দারিদ্র্যবিমোচনের কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে মনে করা হয়। কারণ এর উতপাদন ব্যয় কম এবং চাষ শুরুর ৭-১০ দিনের মধ্য উত্পাদন ব্যয় উসুল করা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষকরা ১০ বর্গমিটার একটি ক্ষেতে প্রতি বছর ১.২টন মাশরুম উত্পাদন করেন। স্থানীয় নারীরা এটি উঠানোর সময় নেচে-গেয়ে উদযাপন করেন।

লেসোথোর রাজধানী মাসেরুর উত্তর দিকে একটি পাহাড়ে ফল গাছ ও ব্লুবেরি চাষ করা হতো। চীনা বিশেষজ্ঞরা এখন সেখানে স্থানীয়দের চুনচাও চাষের পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছেন। লেসোথো একটি পাহাড়ি দেশ এবং পশুপালন দেশটির স্থানীয় প্রধান শিল্প। তবে, তাদের পশুপালন জমিতে খড়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় একজন কৃষক চুনচাও চাষ কেন্দ্রে গিয়ে চীনা বিশেজ্ঞদের সঙ্গে পরিচিত হন। তখন থেকে তিনি চুনচাও চাষ শিখতে শুরু করেন।

তিনি বলেন, চুন চাও ব্যাপকভাবে চাষ হবার পর স্থানীয় পরিবেশ অনেক ভাল হয়েছে। পাশাপাশি চুনচাও সবুজ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।

ত্রিশ বছর বয়সি চেপোখোয়া একজন মাশরুম চাষী এবং চুনচাও ব্যবহার করে তিনি পশুপালন করেন। ২০১৮ সালে তিনি চীন সফর করেছেন এবং তখন তিনি বুঝেছেন চুনচাও মরুকরণ মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক আয় সৃষ্টি করতে পারে এবং এ শিল্পের বড় সম্ভবনা রয়েছে।

লেসোথো কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যা অনুযায়ী, সেদেশের দক্ষিণাঞ্চলে মাত্র ৭.৬ হেক্টর জমি চাষের উপযোগি। তবে এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ জমিতে খড়া সমস্যা ছিল। প্রতি হেক্টর জমিতে খাদ্যের উত্পাদন পরিমাণ মাত্র ০.৫ টন। যদি প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নত হয়, তাহলে ফসলের পরিমাণ বেড়ে ৩ টনে দাঁড়াতে পারে। চীনের চুনচাও জমির খড়া দূর করে। পাশাপাশি, এটি একটি ভাল পশুখাদ্য। লেসোথোর মালভূমিতে আরও বেশি চুনচাও চাষ করে, স্থানীয়রা চাষের জমি পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ করছেন।

রুয়ান্ডা সারা দেশে চুনচাও ও ফল গাছ, ভুট্টা এবং সয়াবিনের যৌথ চাষের  প্রচলন করেছে। পাপুয়া নিউ গিনি, ফিজি, মধ্য আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, মাদাগাস্কার, এবং লাওস চুনচাও চাষকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও মরুকরণ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

ফিজির একটি পশুপালন বিষয়ক কোম্পানির ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, কোম্পানির ৩০০০ একর চারণ ভূমিতে শুকনো মৌসুমে অপর্যাপ্ত ঘাস সমস্যা ছিল। ২০১৬ সালে চীনা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তারা চুনচাও চাষ শুরু করে এবং শুরুতে ৭ একর বড় ভূমিতে পরীক্ষামূলক চাষ করে। তিন মাস পর দেখা যায়, প্রচুর চুনচাও উতপাদন হয় এবং এটি খাওয়ালে গরু ও ছাগলের খুব ভাল শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে। তাই কোম্পানিটি চুনচাও চাষের আয়তন বৃদ্ধি করে। পশুখাদ্য হিসেবে ফিজিতে চুনচাওয়ের ব্যবহার প্রসারিত হচ্ছে। এখন ১০০০জনের বেশি পশুপালক চুনচাও চাষ করছেন এবং শুকনো মৌসুমে পশুর মৃতের হার অনেক কমেছে।

ফিজির আবহাওয়া খুব গরম। তা মাশরুম চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। চীনা বিশেষজ্ঞগণ গবেষণার মাধ্যমে এ সমস্যার সামধান করেন। ফলে ফিজি ইতিহাসে প্রথম বারের মতো মাশরুম চাষ করতে পারে। এখন ৬০০টির বেশি পরিবার মাশরুম চাষ করছে।

ফিজির কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, চুনচাওয়ের সাহায্যে মহামারির সময়ে পশুপালন শিল্প অব্যাহত ছিল। ফলে মাংসের সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।

বাংলাদেশেও চুনচাও চাষ করে ভাল ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে দেশটির উত্তরাঞ্চলের খড়া-পীড়িত এলাকায় সবুজায়ন ও স্থানীয়দের আয় বৃদ্ধিতে এটি  টেকসই সমাধান হতে পারে। কারণ খড়া বা মরুকরণ রোধে চুনচাও চাষ একটি কার্যকর পদ্ধতি। খড়ার মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের মানুষ যেহেতু ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে কাজের উদ্যেশ্যে পাড়ি যমায়। সেহেতু  চুনচাও চাষের মাধ্যমে সে অঞ্চলের মানুষদের অস্থায়ী এবং স্থানীয় অভিবাসনও রুখা যেতে পারে। এক কথায়, বাংলাদেশের দারিদ্র্যবিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের লড়াইয়ে চীন ঢাকা-বেইজিং সহজোগিতা জোরদারে উভয় দেশ লাভবান হতে পারবে।

- লি ওয়ান লু শিশির  একজন চীনা নাগরিক। বর্তমানে তিনি চায়না মিডিয়া গ্রুপের একজন বেইজিং-ভিত্তিক সাংবাদিক।