NAVIGATION MENU

করোনা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল সময় পার করছে


বৈশ্বিক করোনাভাইরাস নিয়ে বাংলাদেশে যে আশঙ্কাটা করা হয়েছিল তা সহসাই সামনে চলে এলো। গত কয়েকদিনের মৃত্যুর পরিসংখ্যাণ তাই বলে দিচ্ছে। বাড়তে বাড়তে শনিবার অবধি মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪ জনে। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২২৪১ জন।না জানি রবিবার আবার শোকাবহ কি খবর মেলে?সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞমহলের ধারণা ছিল এপ্রিলের মাঝামাঝি অবধি বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে গিয়ে আমরা মোটামুটি স্বস্তির শ্বাস নিতে পারবো। 

কিন্তু এই মুহূর্তে আপাতত তার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা্। বরং এখন আগের দিনের মৃত্যুর রেকর্ড পরেরদিন ভেঙ্গে দিচ্ছে।বৃহস্পতিবার করোনায় মারা গেল ১০ জন, শুক্রবার ১৫জন, তবে শনিবার কমে ৯জন মারা গেল। ছোট বাংলাদেশে করোনা হানায় প্রাণ গেল ৮৪ জনের। 

করোনার হানা যে বেড়ে যাবে তা গত বুধবার সরকারি তরফ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে হুশিয়ারী দিয়ে প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। এতে কিছুটা কাজ হলেও ব্যাপক সফলতা মিলছে না। মৃত্যুর খতিয়ান তাই বলে দিচ্ছে কিন্তু।সরকারের কড়া হুশিয়ারীর পরেও পত্র-পত্রিকায় খবর মিলছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে মানুষ আড্ডাবাজী করে যাচ্ছেন। ফল যা তাই- এতে করে কভিড-১৯  রোগীর সংখ্যা  ও সেইসঙ্গে মৃত্যুর তালিকাও দিন দিন বাড়তে শুরু করেছে। 

বিবিসি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে হুশিয়ারী করে বলেছে, বাংলাদেশের জন্য করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এপ্রিল মাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে যেমন সামাজিক সংক্রমণ দেখা দিতে শুরু করেছে, তেমনি সেটা ঠেকিয়ে রাখার জন্য ছুটি/ লকডাউনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তারপরেও রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে হবে। 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় মাত্র সোয়া ঘণ্টার সংসদ অধিবেশনে উদ্বেগের সঙ্গেই বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে এরকম একটা ঝড় উঠবে তা কল্পনার অতীত ছিল। আসলে ভাইরাস-সহ সংক্রামক রোগের কোনও পূর্বের অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে গাইডলাইন অনুসরণ করে আমরা স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা থেকে আমরা কতগুলো পদক্ষেপ সঙ্গে সঙ্গে নিতে থাকি।’ 

তিনি বলেন, ‘আমরা স্কুল, কলেজ-সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছি। প্রত্যেকের যাতায়াত আমরা সীমিত করে দিয়েছি। আমরা বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর বন্ধ করে দিয়েছি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে এমন সব জায়গায় আমরা বিভিন্ন বিধি নিষেধ আরোপ করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে সারা বিশ্বে করোনা পরিস্থিতিতে আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে অধিবেশন বসেছি। এটি একটা বিশেষ অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এ মহামারি মানুষকে বন্দি করে ফেলেছে।’ 

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনা আসার আশঙ্কা পেয়েই আমরা নানা ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর যথাযথ কাজ করছে। করোনা চিকিৎসা সরকারিভাবে করা হচ্ছে। দেশের সব জায়গায় এখন করোনা নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।’ 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ করোনাভাইরাসের কারণে দেশে যেন খাদ্য ঘাটতি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখছে সরকার। বর্তমানে ৫০ লাখ মানুষকে রেশন কার্ড দেওয়া হচ্ছে। আরও ৫০ লাখ লোককে রেশন কার্ড দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এক কোটি লোক খাদ্য সহায়তা পাবেন। আর এই এক কোটি লোকের পরিবারের সংখ্যা যদি পাঁচজন হয় তাহলে পাঁচ কোটি লোক খাদ্য সহায়তার আওতায় আসবেন।’

এরআগে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে প্রবেশে করেছে বাংলাদেশ। কারণ ঢাকার টোলারবাগ ও বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর (শিবচর), গাইবান্ধা (সাদুল্লাপুর)-এসব এলাকায় ‘ক্লাস্টার’ বা গুচ্ছ আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।তারপরও মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এতে করে জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে।এর আগে মার্চ মাসের শেষের দিকে সরকারের রোগ-তত্ত্ব গবেষণা অফিস থেকে বলা হয়- সীমিত আকারে কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে বলে তারা দেখতে পাচ্ছেন।ঢাকার বাইরের অনেকগুলো জেলাতেও করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। যাদের মধ্যে নারী, পুরুষ, শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছে।

এরআগে আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশ এখন সংক্রমণের দিক থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের মাঝামাঝিতে রয়েছে। ভাইরাসটি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়লেও সেটা এখনো ক্লাস্টার আকারে রয়েছে।সংক্রমণের প্রথম স্তর বলা হয়ে থাকে যখন দেশে কোন রোগী শনাক্ত না হয়। দ্বিতীয় স্তর বলা হয়, যখন বিদেশ ফেরতদের মাধ্যমে রোগী শনাক্ত হয়। তৃতীয় স্তর হচ্ছে সীমিত আকারে সমাজে রোগটি ছড়িয়ে পড়া।

‘ক্রিটিক্যাল’ এপ্রিল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন “করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী প্রলয় সৃষ্টি করেছে। সারাবিশ্বে যেভাবে করোনা রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে, আমাদের এখানেও বৃদ্ধি পাওয়ার একটা ট্রেন্ড আছে। তাতে আমাদের সময়টা এসে গেছে, এপ্রিল মাসটা। এই সময় আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে।সামাজিক সংক্রমণ এড়াতে  পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলাকে লকডাউন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। 

ঢাকার ভেতরেও বেশ কয়েকটি এলাকা লকডাউন বলে ঘোষণা করা হয়।লকডাউন করা এসব এলাকায় কেউ ঢুকতে বা বের হতে পারবেন না। লকডাউন করা হয়েছে কক্সবাজার জেলাকেও।কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হওয়ায় সংক্রমণ ঠেকাতে এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে যে সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছিল, তা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হয়েছে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। এ সময় সবরকম যানবাহন, নৌযান, বিমান ও রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। মানুষজনের ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠে কাজ করছে সেনাবাহিনীও। 

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বিবিসিকে বলছেন, “করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের এই এপ্রিল মাসটা খুব ক্রিটিক্যাল।তিনি বলছেন, “ঢাকা শহরেই বেশিরভাগ পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জেও বেশ কিছু রোগী পাওয়া গেছে। এরকম যেসব স্থানে বেশি রোগী পাওয়া গেছে, সেসব এলাকা লকডাউন করে রোগটি সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটা যদি ঠিকভাবে করা যায় তাহলে আমরা বেঁচে যাবো।”

“করোনাভাইরাস কন্ট্রোল করতে হলে সেটা এই এপ্রিল মাসের মধ্যেই করতে হবে। এর চেয়ে বেশি সময় দেয়া যাবে না। আমরা যদি সেটা করতে না পারি, ব্যর্থ হই, তাহলে অবস্থা খুব খারাপ হবে। তখন লম্বা সময় ধরে আমাদের করোনাভাইরাস পুষতে হবে। তাই এই এপ্রিল মাসটা খুব ক্রিটিক্যাল।

তিনি বলছেন, এখন সবকিছু বন্ধ রয়েছে, সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও যদি রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরে আর নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, যে হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সংক্রমণের যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এক কমিউনিটি ট্রান্সমিশন (ব্যাপক জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণ) বলতে বাধা নেই।

রোগী আরো বাড়ার আশঙ্কা: বাংলাদেশের মতো আর্থিক অবস্থার দেশ ভারতে চার সপ্তাহের পর থেকে রোগী বাড়তে শুরু করে। তবে বাংলাদেশে যেখানে ১৬টি কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরু হতেই একমাস লেগে যায়, ভারতে সেটি করা হয় ৬২টি কেন্দ্রে। চিন, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব দেশে প্রথম দিকে করোনাভাইরাসে যে হারে রোগী শনাক্ত হয়েছে, চার সপ্তাহের পরপর পরিস্থিতির রাতারাতি অবনতি হয়েছে। রোগী সংক্রমণ ও মৃত্যু হারও অনেক বেড়ে গেছে।

আরও সমন্বয় দরকার: রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলছেন, এখন যে রোগী শনাক্ত হচ্ছেন, যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের কন্টাক্ট ট্রেসিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা কাদের সঙ্গে মিশেছেন, কোথায় কোথায় গেছেন, কি করেছেন, তাদের বাড়িতে কে এসেছেন, কোন দোকানে গেছেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করা, সেগুলো জানা দরকার। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে নিয়ে টিম গঠন করা দরকার। সেই ঝুঁকি কমাতে কি ব্যবস্থা নেয়া দরকার, কাদের কোয়ারেন্টিন করতে হবে, সেগুলো ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

তিনি বলছেন, রোগের সংক্রমণ ঠেকাতে হলে লকডাউনের পাশাপাশি এসব দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এর ফলে সংক্রমণের হারটা কমানো যাচ্ছে।কিন্তু এসব বিষয় এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, যারা শনাক্ত হচ্ছেন, তাদের ঠিকভাবে চিকিৎসা করা, সংক্রমিতদের সীমাবদ্ধ করে রাখার বিষয়টি জরুরি।যারা হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন, নমুনা সংগ্রহ করছেন, তাদের প্রশিক্ষণ সুরক্ষার ব্যাপারগুলো নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে হাসপাতালগুলো বা চিকিৎসকরা সংক্রমিত হতে শুরু করলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অনেক হুমকি তৈরি করবে।

তৃতীয় আর চতুর্থ স্তরের মাঝামাঝি: রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলছেন, “এখনো বাংলাদেশে কোভিড-১৯ বিস্তার ক্লাস্টার আকারে (ছোট ছোট গ্রুপের মধ্যে) রয়েছে। সেটা কমিউনিটি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে বলবো না। তবে কিছু কিছু রোগী আমরা পাচ্ছি, যাদের সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।আমরা আসলে এটা ট্রান্সজিশন পিরিয়ডের ভেতরে রয়েছি। তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরে (যখন ব্যাপক মানুষের মধ্যে সংক্রমণ দেখা দেয়) যারা লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সর্বোচ্চ স্তরে চলে গেছি সেটি আমি বলবো না।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ সবচেয়ে জরুরি। তারা যদি নিয়মকানুন মেনে বিচ্ছিন্ন থাকেন,ঘরে থাকেন, তাহলেই এটা রোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, আজকের বাংলাদেশ পোস্ট